

ফ্রাঙ্কিয়া তথা গল শহর ছেড়ে ভ্রামণিক চোখ এবার দক্ষিণ ইউরোপের বেল পায়েস-এর দিকে। হাওয়ায় উড়তে উড়তে সিয়াম্পিনো এয়ারপোর্টে পড়ন্ত বিকেলে ইউরোপের বাজেট ফ্রেন্ডলি রায়ান এয়ার অবতরণ করলো। সিয়াম্পিনো অনেক ছোট, অনেকটা নিরিবিলি, তবু তার নিজস্ব এক ব্যস্ত ছন্দ রয়েছে। রোম হতে সিয়াম্পিনো এয়ারপোর্টের দূরত্ব কুল্লে ১৬ কিলোমিটার। আকাশে সূর্যের শেষ আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। বিমান থেকে নেমে চারপাশে তাকিয়ে হঠাৎ এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো। লক্ষ্য করি চারদিকে অপরিচিত মুখ, অচেনা ভাষা, অজানা এক পরিবেশ। মুহূর্তের জন্য মনে হলো যেন পৃথিবীর কোনো নতুন গ্রহে এসে দাঁড়িয়েছি।
ইমিগ্রেশনের সহজ আনুষ্ঠানিকতা সেরে এক্সিট দরজা পেরিয়ে যখন বাইরে এলাম, বুকের ভেতর যেন এক অনাবিল প্রশান্তি আর উত্তেজনা একসঙ্গে কাজ করতে লাগল। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন রূপ নিলো বাস্তবে, চিরন্তন শহর দেখবো এবার নিজ চোখে।
সেই রাতে বিমানবন্দরের কাছের একটি হোটেলে আশ্রয় নিলাম। ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম নিলেও মন যেন বিশ্রাম নিতে রাজি নয়। জানালার বাইরে রাতের নীরবতা, আর মনের ভেতর রোমের হাজার বছরের ইতিহাসের পদচারণা মন চঞ্চল করে রাখে।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙতেই যেন নতুন এক শিহরণে শিহরিত। হালকা ঠান্ডা বাতাসে ভোরের স্নিগ্ধ পরিবেশ কোমল-শান্ত। মেট্রোতে উঠে যখন সেন্ট্রাল রোমের দিকে যাত্রা শুরু করলাম, মনে হচ্ছিল ইতিহাসের এক বিশাল দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রতিটি স্টেশন যেন সময়ের স্তর পেরিয়ে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে এক প্রাচীন সভ্যতার হৃদয়ে।
অতঃপর… আলো ঝলমল দুপুরে, পা রাখি রোম শহরে। পৃথিবীর অনেক শহরই সুন্দর, অনেক শহরই আধুনিক; কিন্তু রোমের সৌন্দর্য আলাদা। এখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, স্থাপত্য আর মানুষের জীবনের ছন্দ একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে এক অনন্য আবহ।
শহরে দৃষ্টিপাতের পূর্বেই মনে পড়লো সদ্য দেখা মোনালিসা’র স্রষ্টা লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে। ফ্লোরেন্সের অদূরবর্তী ভিঞ্চি গ্রামে জন্ম নেন রেনেসাঁ যুগের বিস্ময়কর এই প্রতিভা। ভাস্কর্য ও চিত্রকলার আরেক বিস্ময় মাইকেলেঞ্জেলো’কে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে পড়লো বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন যিনি সেই গ্যালিলিও গ্যালিলি’কে। আর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নতুন পৃথিবীর পথ খুলে দিয়েছিলেন যে অভিযাত্রী আমেরিকার ‘আবিষ্কারক’ ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে ভুলে যাই কি করে! সর্বপ্রথম ইউরোপীয় হিসেবে মঙ্গোলদের সাম্রাজ্যে পদার্পণকারীদের অন্যতম কিংবদন্তি পর্যটক মার্কো পোলো’র ছবিও চোখে ভাসলো। ইতালিতে পা রাখবো আর ডিজাইনার আরমানিকে মনে পড়বেনা তা কি করে হয়। স্টাইলের সংজ্ঞা যিনি পাল্টে দিয়েছিলেন, ইতালির ফ্যাশন সাম্রাজ্যের রাজা, বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ডিজাইনার জর্জিও আরমানিও চোখের সামনে ভেসে ওঠলেন।
ফ্লোরেন্সের আরেক নক্ষত্র দান্তে আলিগিয়েরি। দান্তে ছিলেন মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি ও লেখক, যাকে আধুনিক ইতালীয় ভাষার জনক বলা হয়। দান্তে রচিত “দ্য ডিভাইন কমেডি” পড়া লোক আমি, তাঁকে তো মনে পড়বেই। ভিটা নুওভা তার আরেক অমর সৃষ্টি। মনে পড়লো লুসিয়ানো পাভারোত্তিকেও যিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বেল ক্যান্টো অপেরা গায়ক হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। রোমের ইতিহাসে রাজনীতি ও সাম্রাজ্যের শক্তির প্রতীক হয়ে আছেন জুলিয়াস সিজার। আর আধুনিক ইতালির ঐক্যের নায়ক হিসেবে স্মরণ করা হয় যাঁরে তিনি জুসেপ্পে গারিবালদি। এই মহান বিপ্লবীকে মনে না পড়ার তো কোনো কারণ নেই!
সোফিয়া লরেন। তার প্রেমে কে পড়েনি! চলচ্চিত্রের পর্দায় সৌন্দর্য ও অভিনয়ের মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন আপন আলোয়। রোম শহরের অভিজাত হোটেলের রিসেপশনে পৌঁছানো পর্যন্ত ফুটবলার পাওলো মালদিনি, রবার্তো ব্যাজিও, জিয়ানলুইজি বুফনকেও মনে পড়া তালিকায় যোগ করে নেই।
সিয়াম্পিনোতেই গোসল সেরে এসেছি সুতরাং এই কাজে সময় নষ্ট না করে ব্যাগ রেখেই বেরিয়ে পড়ি শহর দেখতে। এবার “সাত পাহাড়ের শহর” দেখার পালা। প্যালাটাইন, অ্যাভেন্টাইন, ক্যাপিটোলাইন, কুইরিনাল, ভিমিনাল, এসকুইলিন এবং কেইলিয়ান পাহাড়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত শহরের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে সৌন্দর্য। আপন মনে দেখে নেবার পালা। টাইবার নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই শহর অনেকের কাছে “চিরন্তন শহর”। কারণ এই শহরের প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি দেয়াল, এমনকি ছোট্ট কোনো পাথরের মধ্যেও লুকিয়ে আছে হাজার বছরের গল্প। ভোরবেলা যখন সূর্যের আলো ধীরে ধীরে প্রাচীন দালানগুলোর উপর পড়ে, তখন মনে হয় যেন ইতিহাস নিজেই নতুন করে জেগে উঠছে।
দুই পা হেঁটে যাচ্ছে, দুই চোখ দেখছে চারিদিক। এ শহর যেন এক বিশাল খোলা জাদুঘর। কোথাও প্রাচীন স্তম্ভ, কোথাও শত শত বছরের পুরোনো গির্জা, আবার কোথাও রাস্তার পাশে ছোট ক্যাফেতে বসে মানুষ গল্পে গল্পে উপভোগ করছে ইতালিয়ান কফি।
রোমের সৌন্দর্য শুধু তার প্রাচীন স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শহরের সরু গলিপথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখা মেলে কোনো ছোট্ট ক্যাফেতে গল্পে গল্পে মশগুল জুটি, কোথাও আবার শিল্পীর তুলিতে আঁকা জীবন্ত ছবি। আর যখন পৌঁছে যাওয়া যায় ত্রেভি ফাউন্টেন-এর সামনে, তখন জলের শব্দের সাথে মিশে যায় মানুষের আশা। একটি মুদ্রা ছুঁড়ে দিয়ে অনেকেই মনে মনে আবার রোমে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখে!
শহরের ভেতরেই রয়েছে পোপ দ্বারা শাসিত স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকা যেন ধর্মীয় স্থাপত্যের এক অনুপম নিদর্শন। এর গম্বুজের নিচে দাঁড়ালে মানুষের ক্ষুদ্রতা আর সৃষ্টিশীলতার মহিমা একসাথে অনুভূত হয়।
তাড়াহুড়োর বদলে উপভোগের ছন্দে যেন কাটছে মানুষের জীবনযাপন। সন্ধ্যা নামলে শহরটি যেন আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। আকাশের রঙ বদলাতে থাকে, আর আলোয় ঝলমল করে ওঠে প্রাচীন স্থাপত্য। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার গম্বুজ যেন আকাশের সাথে কথা বলে।
রোমের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল এ শহর শুধু ইট-পাথরের নয়, এটি প্রতিভা, ইতিহাস ও স্বপ্নের শহর। প্রতিটি গলি, প্রতিটি প্রাচীন দেয়াল যেন নিঃশব্দে বলে যাচ্ছে শত শত বছরের গল্প। আর আমি এক দূরদেশের পথিক সেই গল্পের ভেতরেই ধীরে ধীরে নিজের পদচিহ্ন আঁকছি।
অতঃপর পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আর সেটা কলোসিয়াম। বিশ্বের নতুন সাত আশ্চর্যের একটি হিসেবে স্বীকৃত এই স্থাপনাটি শুধু পর্যটন আকর্ষণ নয়, বরং রোমান সভ্যতার শক্তি, স্থাপত্যশৈলী এবং বিনোদন সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন।

সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ে, তখন কলোসিয়ামের দেয়ালে পড়ে সোনালি আলো।
যখন কলোসিয়ামের সামনে দাঁড়ালাম, মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমি যেন বর্তমান সময় থেকে অনেক পিছনে চলে গেছি। বিশাল ধূসর পাথরের দেয়ালগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ সেই নীরবতার ভেতর যেন লুকিয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের উল্লাস, ভয় আর রক্তের গল্প। প্রায় পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি দর্শক একসঙ্গে বসে এখানে দেখতেন গ্ল্যাডিয়েটরদের জীবন-মরণ যুদ্ধ।
আজ যখন সেই ভাঙাচোরা দেয়ালগুলোর দিকে তাকাই, মনে হয় এই পাথরগুলো কত ইতিহাস দেখেছে! কত মানুষের উল্লাস, কত মানুষের আর্তনাদ, কত রক্ত আর কত গল্প জমে আছে এই অঙ্গনে, দেয়ালে দেয়ালে।
কলোসিয়ামের ভেতরে দাঁড়ালে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। যেন বাতাসে এখনো ভেসে আসে সেই পুরোনো দিনের চিৎকার-“ভিক্টরি!” কিংবা পরাজিত যোদ্ধার শেষ নিঃশ্বাস।
এখন কলোসিয়াম আর রক্তের গল্প বলে না। আজ এটি মানুষের সৃষ্টিশীলতা, স্থাপত্যশিল্প আর ইতিহাসের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ এখানে এসে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে এই ভেবে যে, কিভাবে এত শতাব্দী আগেও মানুষ এমন অসাধারণ স্থাপত্য নির্মাণ করতে পেরেছিল!
সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ে, তখন কলোসিয়ামের দেয়ালে পড়ে সোনালি আলো। সেই আলোয় মনে হয়- ইতিহাস যেন আবার একটু জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কারও জন্য নীরবে অপেক্ষা করছে তার পুরোনো দিনের গল্প বলার জন্য।
কখনো মানুষ বনাম মানুষ, কখনো মানুষ বনাম হিংস্র পশু। আফ্রিকা থেকে আনা সিংহ, চিতা কিংবা গণ্ডারের সঙ্গে যুদ্ধ করতেন গ্ল্যাডিয়েটররা। দর্শকদের উল্লাসে তখন কেঁপে উঠত এই বিশাল অঙ্গন।
কলোসিয়ামের নিচে ছিল এক রহস্যময় ভূগর্ভস্থ জগৎ যেখানে বন্দি রাখা হতো গ্ল্যাডিয়েটর আর বন্য পশুদের। হঠাৎ করে মঞ্চের নিচের দরজা খুলে তারা উঠে আসত মৃত্যুর লড়াইয়ে।
আজ সেই মঞ্চ নীরব। দর্শক নেই, যুদ্ধ নেই, তবু বাতাসে যেন এখনও ভেসে আসে সেই পুরোনো দিনের প্রতিধ্বনি।
রোম শহরের প্রাচীন কেন্দ্র রোমান ফোরাম-এর ঠিক পশ্চিমে অবস্থিত এই উপবৃত্তাকার স্থাপনাটি। কলোসিয়ামের নির্মাণ শুরু হয়েছিল খ্রিস্টাব্দ ৭০ থেকে ৭২ সালের মধ্যে, রোমান সম্রাট ভেসপাসিয়ান-এর শাসনামলে। পরে ৮০ খ্রিস্টাব্দে তার পুত্র সম্রাট টিটাস-এর রাজত্বকালে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। পরবর্তী সময়ে সম্রাট দোমিতিয়ান এর শাসনামলে কলোসিয়ামে আরও পরিবর্তন ও সম্প্রসারণ করা হয়। কলোসিয়ামের আদি নাম ছিল ফ্ল্যাভিয়ান অ্যাম্ফিথিয়েটার। ধারণা করা হয়, সম্রাট নিরোর বিশাল ব্রোঞ্জের মূর্তি কলোসাস অফ নিরো-এর নাম থেকেই পরে “কলোসিয়াম” নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সম্রাট নিরো-এর শাসনামলে এখানে নির্মিত হয়েছিল বিখ্যাত ডোমাস অরিয়া বা “স্বর্ণ প্রাসাদ”। সেই প্রাসাদের কৃত্রিম হ্রদের জায়গাতেই পরে কলোসিয়াম নির্মিত হয়। সম্রাট ভেসপাসিয়ান জনগণের জন্য সেই এলাকা উন্মুক্ত করতে চান। ফলে নিরোর বিলাসবহুল প্রাসাদের স্থানে তৈরি হয় এই বিশাল জনবিনোদন কেন্দ্র।
৮০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট টিটাসের শাসনামলে গ্ল্যাডিয়েটর প্রিস্কাস ও ভেরুস-এর মধ্যকার যুদ্ধের মাধ্যমে এই অ্যাম্ফিথিয়েটারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। সে যুদ্ধে উভয় যোদ্ধাকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল, যা ছিল এক বিরল ঘটনা। রোমান সম্রাট কমোডাসও নিজে কলোসিয়ামে প্রদর্শনীমূলক যুদ্ধ করেছেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
কলোসিয়ামের স্থাপত্যশৈলী প্রাচীন রোমান প্রকৌশলের এক বিস্ময়। উপবৃত্তাকার এই স্থাপনাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৮৯ মিটার এবং প্রস্থ ১৫৬ মিটার। বাইরের দেয়ালের উচ্চতা প্রায় ৪৮ মিটার এবং পুরো স্থাপনাটি প্রায় ২৪ হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর কেন্দ্রীয় মঞ্চ বা এরেনার দৈর্ঘ্য ৮৭ মিটার এবং প্রস্থ ৫৫ মিটার। মঞ্চের নিচে তৈরি করা হয়েছিল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথ, যেখানে গ্ল্যাডিয়েটর ও বন্য প্রাণীদের রাখা হতো। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সেখান থেকেই তারা মঞ্চে প্রবেশ করত।
কলোসিয়ামের বাহ্যিক দেয়াল নির্মাণে প্রায় এক লক্ষ ঘনমিটার ট্রাভারটাইন পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো এগুলো কোনো মসলা ছাড়াই কেবল লোহা ও ব্রোঞ্জের ক্ল্যাম্প দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছিল।
সময়ের প্রবাহে মানুষের রুচি বদলেছে। ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট হনোরিয়াস গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তারপর কলোসিয়াম বহুবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় এর অনেক অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। মধ্যযুগে এই স্থাপনাটি বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে- কখনো আবাসন, কখনো সামরিক ব্যারাক, কখনো তীর্থযাত্রীদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে। ১২শ শতাব্দীতে প্রভাবশালী ফ্রাঞ্জিপানি পরিবার এটিকে দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
তবুও নানা বিপর্যয় সত্ত্বেও কলোসিয়ামের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি অংশ এখনো টিকে আছে, যা রোমান স্থাপত্যের শক্তি ও স্থায়িত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। দুই হাজার বছর আগে নির্মিত একটি স্থাপনা আজও দাঁড়িয়ে আছে, ইতিহাসের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে।

দুই হাজার বছর আগে নির্মিত একটি স্থাপনা আজও দাঁড়িয়ে আছে, ইতিহাসের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে।
আজকের দিনে কলোসিয়াম শুধু একটি ধ্বংসাবশেষ নয়; এটি বিশ্বের নতুন সাত আশ্চর্যের একটি। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এখানে আসেন। কেউ ইতিহাস জানতে, কেউ স্থাপত্য দেখতে, আবার কেউ শুধু দাঁড়িয়ে অনুভব করতে চান সেই অতীতের স্পন্দন। আর তাই, যখন কেউ কলোসিয়ামের সামনে দাঁড়ায়, তখন সে শুধু একটি স্থাপত্য দেখে না, সে যেন দুই হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে চোখে চোখ রাখে।
ইংরেজি ইতিহাসের জনক, বিখ্যাত ইংরেজ সন্ন্যাসী, লেখক এবং পণ্ডিত সেইন্ট ভেনেরেবল বেড বলেন, “কলোসিয়াম যতদিন দাঁড়িয়ে থাকবে, রোমও ততদিন টিকে থাকবে; কলোসিয়াম যখন পড়ে যাবে, রোমও পড়ে যাবে; আর রোম যখন পড়ে যাবে, তখন পৃথিবীও শেষ হয়ে যাবে।” তিনি যা বলেছেন সেটা তাঁর একান্ত মতামত তবে এইটুকু সত্য যে, কলোসিয়াম পড়ে গেলে ইতালীয় অনন্য এক ইতিহাসের মৃত্য হবে।
জুলিয়াস সিজারের মত করেই বলি, “আমি এসেছি, দেখেছি, জয় করেছি” (Veni, vidi, vici)। আমার বেলায়ও তাই। প্রত্যাশার প্রাপ্তিতে আমি উদ্বেলিত। কলোসিয়ামে হৃদয়-মন পরম তৃপ্ত। কালের স্রোত যতই এগিয়ে যাক না কেন, দুই হাজার বছরের ঝড়ঝাপটা পেরিয়েও কলোসিয়াম আজও দাঁড়িয়ে আছে রোমের গৌরবের প্রতীক হয়ে।
ফিরছি হোটেলে আর ভাবছি কলোসিয়াম এমন একটি জায়গা যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ উপলব্ধি করে সভ্যতার উত্থান-পতন, মানুষের নির্মমতা, আবার মানুষের সৃষ্টির অমরত্ব। রোমের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল স্থাপনাটি যেন নীরবে বলে যায়, সময় অনেক কিছু ধ্বংস করে দেয়, কিন্তু ইতিহাসকে মুছে ফেলতে পারে না। কলোসিয়ামের প্রতিটি ইটের ভেতর ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে। আর আমি, দূরদেশের এক পথিক সেই ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছি, বিস্ময়ে, মুগ্ধতায়, বেদনায় আবার অদ্ভুত এক আনন্দে।
রোম শহর অনেক গল্প বলে, কিন্তু কলোসিয়াম সেই গল্পগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক।
আবুল কাসেম