❝সিরাজ এমপি ভালো পরামর্শ দিতে পারবেন, উনার কাছে যাও❞- মন্তজির চেয়ারম্যান চাচার এই কথাটিই যেন এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল। উনার কথামত সিরাজ এমপির কাছে গিয়েছি, তারপর বারবার গেছি, কথা বলেছি, শুনেছি, শিখেছি। সেই যাওয়া আর থামেনি- চলেছে আমৃত্যু।
২০০৩ সালের কথা। “কিশোর ভোরের শিশির” ম্যাগাজিনের প্রকাশনা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছি। আমন্ত্রণপত্রে তাঁর নাম দেওয়া হয়েছিল শাহাব উদ্দিন এমপির পরে। বিষয়টি নিয়ে হঠাৎ করেই চেনা-জানাদের মধ্যে এলাকায় একটু হৈচৈ তৈরি হলো। মনে শঙ্কা-তিনি কি এতে কষ্ট পাবেন? পরামর্শ নিতে গেলাম তালিমপুর ইউনিয়নের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ফরিজ আলী চাচার কাছে। তিনি হেসে আশ্বস্ত করলেন, “স্যার উদার মনের মানুষ, আমি বলবো-উনি অনুষ্ঠানে থাকবেন।”
সত্যিই, তিনি ছিলেন উদারতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কোনো ক্ষুদ্রতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি কখনো।
জীবনের নানা সময়ে তাঁর সঙ্গে বসার, কথা বলার যে সুযোগগুলো পেয়েছি- সেগুলো আমার কাছে একেকটি অনবদ্য অর্জন। যতবার তাঁর সান্নিধ্যে গেছি, ততবারই মুগ্ধ হয়েছি তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর বিশ্লেষণ, তাঁর মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধে। আমার দেখা বড়লেখার সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান মানুষ- তিনি, সিরাজুল ইসলাম।
একবার প্রথম আলোর বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি সাত্তার আজাদ দেশসেরা প্রতিনিধি হিসেবে পুরস্কৃত হলেন। সেই উপলক্ষে পিসি উচ্চ বিদ্যালয়ে বড়লেখা সাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। কবি ফজলুল হককে বললাম- আপনি প্রধান অতিথি হবেন। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “বড়লেখায় সিরাজ এমপি থাকতে প্রধান অতিথি নিয়ে আবার চিন্তা করতে হয় নাকি!”
সেদিন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে সিরাজ এমপি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন- তা আজও কানে বাজে। সংক্ষিপ্ত, অথচ গভীর; সহজ, অথচ হৃদয়ছোঁয়া-এটাই ছিল তাঁর কথা বলার স্বভাব। ধীর-স্থির। আমরা সত্যিই ধন্য- বেঁচে থাকা সময়ে আমরা একজন সিরাজ এমপি পেয়েছিলাম।
পাথারিয়া পাহাড়ের নীরবতা আর হাকালুকি হাওরের বিস্তৃত জলরাশির মাঝখানে যে জনপদ, সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন এক অনন্য মানুষ। তিনি সিরাজুল ইসলাম। এই নামটি কেবল একজন রাজনীতিকের পরিচয় নয়; বরং একটি জনপদের স্পন্দন, এক ভালোবাসার প্রতিধ্বনি, এক ইতিহাসের জীবন্ত রূপ।
১৯৪৩ সালে তালিমপুর ইউনিয়নের টেকাহালি গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একদিন নিজের বাসভবনে বসে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন- “আমার শৈশব ছিল সরল, স্বপ্ন ছিল বিশাল।” ছোটবেলা থেকেই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন- জীবন শুধু নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু হলেও তাঁর মন আটকে থাকেনি চার দেয়ালের ভেতর। দেশের মানুষের বঞ্চনা, অধিকারহীনতা, আর সময়ের অস্থিরতা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় রাজপথে।
ষাটের দশকের উত্তাল সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন ছাত্ররাজনীতির এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। অবিভক্ত সিলেট জেলায় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে সংগঠন পায় নতুন গতি, নতুন প্রাণ। তাঁর কণ্ঠে ধীর হলেও ছিল দৃঢ়তা, তাঁর নেতৃত্বে ছিল সাহস, আর তাঁর হৃদয়ে ছিল মানুষের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান- বাংলার জাগরণের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সেই ইতিহাসে তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিকদের একজন। রাজপথের প্রতিটি স্লোগানে, প্রতিটি মিছিলে ছিল তাঁর অকুতোভয় উপস্থিতি।
তারপর ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার ডাক।
তিনি আর শুধু রাজনীতিক নন বরং তিনি হয়ে ওঠেন এক নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ ছিল না কোনো ক্ষণিকের ঘটনা; এটি ছিল এক চিরন্তন বিশ্বাস, এক দায়, যা তিনি সারাজীবন বহন করেছেন।
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করেন। মৌলভীবাজার জেলায় সংগঠন গড়ে তোলা, তৃণমূলকে শক্তিশালী করা এসবের পেছনে ছিল তাঁর নিরলস পরিশ্রম।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তরুণ বয়সেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ছিল মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে থেকে তিনি শিখেছিলেন- রাজনীতি মানে মানুষের পাশে থাকা, মানুষের জন্য কাজ করা।
পঁচাত্তরের পরবর্তী সময় ছিল এক কঠিন অধ্যায়। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে, যখন জিয়াউর রহমান-এর নেতৃত্বে দেশজুড়ে বিএনপির গণজোয়ার। সেই গণজোয়ার ডিঙিয়ে তিনি বিজয়ী হন, বড়লেখার মানুষ তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকেই বেছে নেয়। সেদিন তাঁর সেই বিজয় ছিল আস্থার, ভালোবাসার। লোকমুখে তখন একটি কথাই ছিল-এটি কোনো দলের জয় নয়, এটি “সিরাজ লীগের” জয়!
রাজনীতির পথে তাঁকে পোহাতে হয়েছে অনেক বঞ্চনা, দলীয় টানাপোড়েন, অবমূল্যায়নের যন্ত্রণা। তবুও তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। কারণ তাঁর রাজনীতির শক্তি ছিল মানুষ- ক্ষমতা নয়, ভালোবাসা।
তিনি নেতা ছিলেন, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিলেন মানুষ। দুর্ভিক্ষে খাদ্য নিয়ে ছুটে যাওয়া, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের দুঃখে-সুখে অংশ নেওয়া- এসব ছিল তাঁর জীবনের অংশ।
মানুষ তাঁকে দূরের নেতা হিসেবে দেখেনি বরং নিজেদের খুব কাছের একজন মনে করেছে সবসময়। তাঁর হৃদয় ছিল মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ক্ষমতা থাক বা না থাক- বড়লেখার রাজনীতি তাঁর নামেই আবর্তিত হতো। তিনি ছিলেন সেই বিরল নেতা, যাঁর নির্বাচনের সমস্ত ব্যয়-ভারের দায়িত্ব মানুষজনই বহন করত!
জীবনের শেষভাগে তিনি সরে যান জনজীবনের কোলাহল থেকে। প্রবাসে কাটান নিভৃত সময়। একসময় যিনি হাজার মানুষের ভিড়ে ছিলেন কেন্দ্রবিন্দু, তিনি ধীরে ধীরে হারিয়ে যান নীরবতার আড়ালে। হয়তোবা প্রচন্ড অভিমানে!
২০২০ সালের ৫ এপ্রিল। বড়লেখার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বেদনাভরা দিন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিউইয়র্কের এল্মহার্স্ট হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন হাকালুকি পারের জনদরদী নেতা সিরাজুল ইসলাম।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বড়লেখায় হয়তো বড় কোনো আয়োজন হবে না, কিন্তু এটা নিশ্চিত- যারা তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরা তাঁকে স্মরণ করবেন গভীর শ্রদ্ধায়, নীরব ভালোবাসায়। বড়লেখার রাজনৈতিক গল্পে তাঁকে রাখতেই হবে। তিনি শিখিয়েছেন- নেতৃত্ব মানে পদ নয়, নেতৃত্ব মানে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া।
স্মৃতির মণিকোটায় অমলিন এক নাম- সিরাজুল ইসলাম। বিনম্র শ্রদ্ধায়, পরম ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতায় আজ তাঁকে স্মরণ করছি। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।